সাম্প্রতিক সময়ে দেশে হামের প্রকোপ ও এর ফলে শিশু মৃত্যুর ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের জনস্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া শিশুদের একটি বড় অংশই অত্যন্ত কম বয়সী। মৃত শিশুদের মধ্যে প্রায় ৬৩ শতাংশেরই বয়স ৯ মাসের নিচে, এবং বাকি অধিকাংশ শিশুর বয়স এক বছরের মধ্যে। সাধারণত সরকারি টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী শিশুদের ৯ মাস পূর্ণ হলে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ হামের টিকা দেওয়া হয়। ফলে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরা প্রাকৃতিকভাবে মায়ের শরীর থেকে পাওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু বর্তমানে টিকাদান কার্যক্রমে কিছুটা ঘাটতি এবং সামগ্রিক কমিউনিটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ‘হার্ড ইমিউনিটি’ কমে যাওয়ার কারণে এই দুধের শিশুরাই সবার আগে ভাইরাসের সংস্পর্শে আসছে এবং মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হচ্ছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হামে প্রাণ হারানো শিশুদের সিংহভাগই হয় সম্পূর্ণ টিকাহীন ছিল, অথবা তাদের টিকাদান কোর্স সম্পন্ন করা হয়নি। হামের মূল ভাইরাসটি ছাড়াও আক্রান্ত হওয়ার পর শরীরে তৈরি হওয়া বিভিন্ন জটিলতা, যেমন—তীব্র নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং অপুষ্টির কারণে শিশুরা দ্রুত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চল ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিশুরা পুষ্টিহীনতার কারণে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্বাস্থ্য বিভাগ ইতোমধ্যে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ৯ মাসের পরিবর্তে ৬ মাস বয়স থেকেই শিশুদের হামের বিশেষ টিকা প্রদান শুরু করেছে।
টিকা নেওয়ার আগেই আক্রান্ত ও মৃত্যুর কারণ: সরকারি টিকাদান কর্মসূচি (EPI) অনুযায়ী, শিশুদের সাধারণত ৯ মাস পূর্ণ হলে হামের প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়া হয়। নবজাতকেরা প্রথম কয়েক মাস প্রাকৃতিকভাবে মায়ের শরীর থেকে আসা অ্যান্টিবডির কারণে সুরক্ষিত থাকে। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে অনেক মায়ের শরীরে প্রাকৃতিক সংক্রমণের পরিবর্তে কেবল টিকার মাধ্যমে তৈরি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকায়, তা শিশুদের ৯ মাস পর্যন্ত পূর্ণ সুরক্ষা দিতে পারছে না। পরিসংখ্যান বলছে, হামে নিশ্চিতভাবে মারা যাওয়া শিশুদের প্রায় ৬৩ শতাংশেরই বয়স ছিল ৯ মাসের কম। এমনকি মৃত শিশুদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের বয়স ছিল মাত্র ৬ মাস বা তারও কম। ফলে বয়স হওয়ার আগেই তারা ভাইরাসের সংস্পর্শে এসে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে।
টিকা বঞ্চিতদের উচ্চ ঝুঁকি ও হার্ড ইমিউনিটির অভাব: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত হওয়া শিশুদের প্রায় ৭৭ শতাংশই সম্পূর্ণ টিকাহীন ছিল। বিগত বছরগুলোতে দেশের কিছু অঞ্চলে নিয়মিত টিকাদানের কভারেজ কমে যাওয়ার কারণে ভাইরাসের চক্রটি পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাইরাসের বিস্তার রুখতে হলে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় এনে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা সমষ্টিগত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করা জরুরি। এই প্রতিরোধ ব্যাহত হওয়ায় এখন যারা টিকা নিয়েছে বা যাদের বয়স কম, তারাও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ভৌগোলিকভাবে, দেশের আটটি বিভাগেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে, যার মধ্যে ঢাকা বিভাগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি; বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকাগুলোতে সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে।
মারাত্মক শারীরিক জটিলতা ও জরুরি চিকিৎসা : হাম মূলত শ্বাসতন্ত্রের একটি ভাইরাসজনিত রোগ হলেও এটি শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে চরমভাবে দুর্বল করে দেয়। আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর মূল কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে এর পরবর্তী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা জটিলতাসমূহ, যেমন—তীব্র নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখের সংক্রমণ এবং মেনিনজাইটিস বা এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ)। বিশেষ করে অপুষ্টি এবং ভিটামিন ‘এ’-এর অভাব থাকা শিশুরা এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারছে না। অত্যন্ত সংক্রামক এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর দ্রুত সঠিক সময়ে চিকিৎসা না দেওয়া এবং দেরিতে হাসপাতালে ভর্তির কারণে লক্ষণ প্রকাশের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অনেকের মৃত্যু হচ্ছে।
বর্তমান পদক্ষেপ ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান : এই জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় সরকার ও স্বাস্থ্য বিভাগ জরুরি তৎপরতা শুরু করেছে। অতি ঝুঁকিপূর্ণ ও উপদ্রুত এলাকাগুলোতে শিশুদের সুরক্ষায় ৯ মাসের নির্ধারিত সময়ের অপেক্ষা না করে ৬ মাস বয়স থেকেই হামের বিশেষ টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। তবে এই পরিস্থিতি থেকে স্থায়ীভাবে মুক্তি পেতে হলে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির (EPI) শতভাগ বাস্তবায়ন, প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে ভ্রাম্যমাণ ক্যাম্পেইন বৃদ্ধি, আক্রান্ত শিশুদের জন্য দ্রুত হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা এবং অপুষ্টি দূরীকরণে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য।







