ঢাকাশনিবার , ১৩ জুন ২০২৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট, সংস্কারের উচ্চাভিলাষ ও বাস্তবায়নের কঠিন বাস্তবতা

admin
জুন ১৩, ২০২৬ ১২:০২ পূর্বাহ্ণ

Link copied !

জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটটি দেশের সমকালীন অর্থনীতি ও রাজনীতির এক ক্রান্তিলগ্নে ঘোষিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। স্বাভাবিকভাবেই, দীর্ঘ দেড় দশকের পুঞ্জীভূত অনিয়ম, তীব্র ডলার সংকট, ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত এবং সাধারণ মানুষের পিঠে চেপে বসা লাগামহীন মূল্যস্ফীতির পটভূমিতে এই বাজেটকে ঘিরে জনমনে প্রত্যাশার পারদ ছিল আকাশচুম্বী। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী কর্তৃক ঘোষিত ৯,৩৮,০০০ কোটি টাকার এই বিশাল বাজেটটি যেমন দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও কাঠামোগত সংস্কারের এক সাহসী রূপরেখা নির্দেশ করে, তেমনি এর বিশাল লক্ষ্যমাত্রাগুলোর ভেতর লুকিয়ে থাকা বাস্তবায়ন-চ্যালেঞ্জ নিয়েও অর্থনীতিবিদ ও সচেতন মহলে তৈরি হয়েছে গভীর সংশয় ও সমালোচনা। আলোচনা ও সমালোচনার এই দোলাচলে বাজেটটির গতিপ্রকৃতি নিবিড় বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

বাজেটের ইতিবাচক বা প্রশংসনীয় দিকগুলোর দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়, সরকার প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে কিছুটা প্রগতিশীল ও মানবিক হওয়ার চেষ্টা করেছে। এই বাজেটের সবচেয়ে বড় সাফল্য ও প্রশংসার জায়গা হলো দেশের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ অভূতপূর্বভাবে প্রায় দ্বিগুণ করে ৬৯,৪০৯ কোটি টাকায় (জিডিপির ১.০২ শতাংশ) উন্নীত করা। ক্যানসারের ওষুধ, কিডনি ডায়ালাইসিস সামগ্রী এবং হার্টের রিংয়ের ওপর থেকে শুল্ক ও ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার বা হ্রাস করার সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের দীর্ঘশ্বাসের অবসান ঘটাবে। প্রতিটি নাগরিকের জন্য ‘ইউনিভার্সাল হেলথ কার্ড’ চালু এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিচ্ছবি। একই সাথে, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কাঁচামাল, দেশে তৈরি রেফ্রিজারেটর, মোবাইল ও ওয়াশিং মেশিনের উৎপাদন পর্যায়ে কর রেয়াত দিয়ে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডকে শক্তিশালী করার যে প্রয়াস নেওয়া হয়েছে, তা প্রশংসার দাবিদার। তৈরি পোশাক শিল্পে ম্যান-মেড ফাইবারের ওপর শুল্ক হ্রাস এবং উৎস কর ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা রপ্তানি বহুমুখীকরণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তামাকজাত পণ্যের ওপর ‘সিন ট্যাক্স’ বা পাপ করের মাধ্যমে উচ্চ কর আরোপ এবং বিলাসবহুল গাড়ি আমদানিতে কঠোর শুল্কায়ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই অত্যন্ত সময়োপযোগী।

তবে এই আলোর পিঠের সমান্তরালে যে অন্ধকার বা সমালোচনার দিকটি রয়েছে, তা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অর্থনীতির প্রধান প্রধান থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক এবং বিশ্লেষকদের মতে, বাজেটের প্রাক্কলিত লক্ষ্যমাত্রাগুলো অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং বাস্তবতাবিবর্জিত। বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় যেখানে সংকুচিত, সেখানে ৬,৯৫,০০০ কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৬০৪,০০০ কোটি টাকাই তুলতে হবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (ঘইজ)। করের আওতা নাটকীয়ভাবে না বাড়িয়ে এই বিশাল রাজস্ব আদায় করতে গেলে শেষ পর্যন্ত তা সৎ করদাতা ও সাধারণ ভোক্তার ওপর পরোক্ষ কর বা ভ্যাটের বোঝা হয়ে চেপে বসবে। সবচেয়ে বড় সমালোচনার জন্ম দিয়েছে বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের কৌশল। ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১.১২ লাখ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার যে পরিকল্পনা সরকার করেছে, তা ইতিমধ্যেই তারল্য সংকটে ভোগা ব্যাংকিং খাতকে আরও পঙ্গু করে দিতে পারে। সরকার যদি ব্যাংক থেকে সব টাকা তুলে নেয়, তবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ (যা বর্তমানে ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৪.৭২ শতাংশে নেমেছে) আরও সংকুচিত হবে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে নতুন শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে।

অন্যদিকে, নিট বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় দ্বিগুণ করে ১.১ লাখ কোটি টাকা করায় দেশের দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের দায় ও ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে। বাজেটের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর নির্দেশনার অভাব। দেশের সাধারণ মানুষের বর্তমান প্রধানতম সংকট হলো দৈনিক জীবনযাত্রার ব্যয় বা ‘কস্ট অফ লিভিং’। অর্থমন্ত্রী মূল্যস্ফীতিকে ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার কাগুজে লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করলেও বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা, টিসিবির পরিধি জ্যামিতিক হারে বাড়ানো এবং নিত্যপণ্যের সরবরাহ চেইনকে চাঁদাবাজিমুক্ত করার কোনো বাস্তবসম্মত ও দৃশ্যমান রোডম্যাপ বাজেটে প্রতিফলিত হয়নি। পাশাপাশি, জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন ফি বা উৎসে করের কাঠামো পুনর্বিন্যাস করায় আবাসন খাত স্থবির হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে, যা পরোক্ষভাবে নিম্ন-মধ্যবিত্তের আবাসন স্বপ্নকে বাধাগ্রস্ত করবে।