বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। আর দেশের জনসংখ্যার শতকরা ৭৫ ভাগ মানুষ গ্রামে বসবাস করে। কৃষি প্রধান দেশে হিসেবে বৃহত্তর গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রধান পেশা কৃষি। অধিকাংশ জনগণই জীবন-জীবিকা ও কর্মসংস্থানের জন্য কৃষির উপরে নির্ভরশীল। মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান ১৯.১% এবং কৃষিখাতের মাধ্যমে ৪৮.১% মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
দেশের কৃষি খাতে এখনো রয়েছে যথাযথ প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাব। অভিযোগ আছে দেশের সরকারি বা বেসরকারি সংস্থাগুলোর কাছ থেকে যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় কৃষি উৎপাদনে কৃষকদের মাঝে দিনদিন অনীহা দেখা দিচ্ছে। এতে করে রপ্তানি পণ্য এক সময় আমদানি নির্ভর হতে হয়।
গ্রামাঞ্চলগুলোতে কৃষি পণ্য উৎপাদন হওয়ায় যাতায়াত ব্যবস্থা খুবই ব্যয়বহুল। যানবাহন ও যাতায়াত ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে বাড়তি টাকা যোগ হয়। এতে করে গ্রামাঞ্চল থেকে কৃষি পণ্য রাজধানী বা অন্য কোন অঞ্চলে পৌঁছাতে দাম বেড়ে দুই থেকে তিন গুণ হয়ে যায়।
তাছাড়া কৃষি পণ্যগুলো কয়েক হাত হয়ে রাজধানীর বাজারগুলোতে পৌঁছায়। এতে করে কৃষি পণ্যের দাম অধিকাংশে বৃদ্ধি পায়। কৃষি পণ্যগুলো হাত-বেহাত না হয়ে সরাসরি কৃষকের জমি থেকে পাইকারী বা খুচরা বিক্রেতার কাছে এসে পৌঁছায়। তাহলে নির্দিষ্ট লাভের পর খুব অল্প দামেই কৃষিপণ্য ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাবে। এদিকে সিন্ডিকেট করার মতো সুযোগ থাকবে না। এখানে কিন্তু কৃষকের কোন লাভ হচ্ছে না। অনেক সময় কৃষি পণ্যের সঠিক মূল্য না পেয়ে কৃষকদের মধ্যে উৎপাদনে অনীহা দেখা দেয়।
এদিকে কৃষি জমি ভরাট করে বাড়ি-ঘর, রাস্তা-ঘাট, কল-কারখানা তৈরি হওয়াসহ নানান কারণে কৃষি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। ফসলি জমিতে ব্যবহারযোগ্য সার ও কীটনাশক কৃষিপণ্য আমদানি করতে হয়। বাজারে এসব পণ্যের দাম অধিকাংশই বেশি। এতে করে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়।
কৃষিতে ব্যবহৃত আধুনিক যন্ত্রপাতির দাম ব্যয়বহুল হওয়ায় অধিকাংশ কৃষক এখনো সনাতন পদ্ধতিতে চাষাবাদ করছে। এতে উৎপাদনের তুলনায় সময় ও শ্রম দুটিই ব্যয় হচ্ছে অধিক। কৃষি প্রধান দেশ হিসেবে কৃষি উৎপাদন পণ্যের সহজলভ্যতা প্রয়োজন। কৃষি উৎপাদনে আধুনিক যন্ত্রপাতি, সার, কীটনাশক, চাষাবাদ যন্ত্রপাতির সহজলভ্য করা প্রয়োজন। যাতে করে স্বল্প খরচে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।
কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দেশের খাদ্য শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় ভোক্তা অধিকারের বাজার মনিটরিং চালু রাখা। খাদ্য নিরাপত্তা আইন করা। মনিটরিং এর মাধ্যমে বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া। প্রান্তিক কৃষকদের সাহায্য সহযোগিতার মাধ্যমে ‘কৃষক ও কৃষি’কে শক্তিশালী খাত হিসেবে রূপান্তর করতে হবে। আমরা বাণিজ্যিক নির্ভর না হয়ে কৃষি নির্ভর হই।
তাছাড়া ধান, পাট, তুলা, আখ, ফুল ও রেশমগুটির চাষসহ বাগান সম্প্রসারণ, মাছ চাষ, সবজি, পশুসম্পদ উন্নয়ন, মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি, বীজ উন্নয়ন ও বিতরণ ইত্যাদি বিষয়সমূহ এ দেশের কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিভাগে কর্মকাণ্ডের অন্তর্ভুক্ত।
অতএব, দেশের কৃষি খাতকে আরো উন্নত, আধুনিক ও সহজলভ্য হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। উন্নত জাতের বীজ উৎপাদন ও গবেষণাসহ কৃষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আর অভিজ্ঞ করে তুলতে হবে। কৃষি পণ্যগুলো সারা বছরই চাষাবাদ করে উৎপাদন করা যায়।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশ থেকে ৬৩ মৌলিক প্রক্রিয়াজাত পণ্যসহ সাত শতাধিক কৃষিপণ্য রপ্তানি করা হয়। প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে আছে হিমায়িত মাছ, চিংড়ি ও অন্যান্য হিমায়িত খাদ্য পণ্য, চা, মসলা, শুকনো ফলসহ অন্যান্য ফল এবং কিছু প্রক্রিয়াজাত কৃষি পণ্য। প্রধান পণ্যগুলো রপ্তানি করা হয় মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যে।
মোহাম্মদ ইমরান স্বপন: সাহিত্যিক ও গণমাধ্যম কর্মী







