ঢাকারবিবার , ৩ মে ২০২৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মুক্ত গণমাধ্যম : পেশাদারিত্ব বনাম দলীয় লেজুড়বৃত্তি

admin
মে ৩, ২০২৬ ৬:২৯ অপরাহ্ণ

বিশ্বজুড়ে যখন ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ বিভাজন তীব্র হচ্ছে, তখন তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই শান্তির পথে ফেরার একমাত্র উপায়। ইউনেস্কোর সাম্প্রতিক তথ্যমতে, ২০১২ সালের পর বর্তমানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বৈশ্বিক স্তরে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা চরম সংকটে।

আজ ৩ মে, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা এই দিবসটি পালন করছি, তখন বিশ্বজুড়ে তথ্যের অবাধ প্রবাহের পাশাপাশি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মৌলিক চরিত্র নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশে এই দিনটি কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে নয়, বরং গভীর আত্মোপলব্ধির মধ্য দিয়ে পালিত হওয়া প্রয়োজন।

একটি দেশ কতটা গণতান্ত্রিক, তার সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হলো সে দেশের সংবাদমাধ্যম কতটা স্বাধীন। স্বাধীন গণমাধ্যম সরকারের ভুল ধরিয়ে দেয়, দুর্নীতির চিত্র সামনে আনে এবং জনগণের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে। যখন গণমাধ্যমকে সেন্সরশিপ বা ভয়ের মাধ্যমে কণ্ঠরোধ করা হয়, তখন রাষ্ট্র তার নিজের ভুল দেখার আয়না হারিয়ে ফেলে। এতে কেবল সাংবাদিকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, বরং গোটা জাতি অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়।

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘নিরপেক্ষতা নীতি’ থেকে বিচ্যুতি। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, গণমাধ্যমগুলো জনস্বার্থের অতন্দ্র প্রহরী হওয়ার পরিবর্তে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রোপাগান্ডা মেশিনে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে গণমাধ্যমের সংখ্যা বাড়লেও গুণগত মান ও বস্তুনিষ্ঠতা আনুপাতিক হারে বাড়েনি। অনেক গণমাধ্যম মালিক তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা বা রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য সংবাদমাধ্যমকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। ফলে সাংবাদিকরা সত্যের পরিবর্তে নির্দিষ্ট দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে লিপ্ত হচ্ছেন।

আজ সাংবাদিক সমাজ দ্বিধাবিভক্ত। জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে শুরু করে ইউনিয়নগুলোও এখন রাজনৈতিক রঙে রঞ্জিত। এই বিভাজন সাংবাদিকদের ঐক্য নষ্ট করছে এবং সরকারের বা প্রভাবশালী মহলের জন্য গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ করে দিচ্ছে।

মুক্ত গণমাধ্যমের পথে বাংলাদেশ বর্তমানে এক জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে যেমন নতুন বাংলাদেশে মতপ্রকাশের অবারিত সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে অদৃশ্য কিছু বাধা এখনো বিদ্যমান। নিবর্তনমূলক বিভিন্ন আইনের ভীতি এখনো সাংবাদিকদের মন থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি। সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে আইনি হয়রানির ভয় সাংবাদিকতাকে ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’-এর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

দেশের বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী এখন গণমাধ্যমের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় এমন সংবাদগুলো ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে। এতে জনস্বার্থ উপেক্ষিত থাকছে। ঢাকা-কেন্দ্রিক সাংবাদিকতা কিছুটা সুরক্ষিত থাকলেও মফস্বল বা তৃণমূল পর্যায়ে সাংবাদিকরা এখনো প্রভাবশালী নেতা ও মাফিয়াদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না।

এআই এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই যুগে পেশাদার গণমাধ্যমের দায়িত্ব ছিল গুজব প্রতিরোধ করা। কিন্তু যখন মূলধারার গণমাধ্যমই নিরপেক্ষতা হারিয়ে কোনো পক্ষের হয়ে কাজ করে, তখন সাধারণ মানুষ তথ্যের জন্য অনির্ভরযোগ্য উৎসের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এটি সমাজে অস্থিরতা ও মেরুকরণ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

মুক্তির পথ কী?
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত সাংবাদিকতাকে তার আদি ও অকৃত্রিম রূপে ফিরিয়ে নেওয়া। সংবাদকক্ষ পরিচালনায় মালিকপক্ষের হস্তক্ষেপ বন্ধ করে সম্পাদককে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। ‘পেশা আগে, দল পরে’—এই নীতিতে সাংবাদিকদের ফিরে আসতে হবে। সংবাদকর্মী যখন কোনো দলের মুখপাত্র হন, তখন তিনি আর সাংবাদিক থাকেন না, হয়ে পড়েন প্রচারকর্মী।

একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা জরুরি, যা কোনো দলের প্রতি অনুগত না থেকে কেবল পেশাদারিত্ব ও গণমাধ্যমের মান রক্ষা নিশ্চিত করবে। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যমকে তখনই সম্মান করা হবে, যখন সে নিরপেক্ষ আয়নার মতো সমাজের সঠিক চিত্র তুলে ধরবে। দলীয় লেজুড়বৃত্তি ও চাটুকারিতা কেবল সাংবাদিকতাকেই ধ্বংস করে না, বরং দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভিত্তি দুর্বল করে দেয়।