ঢাকাশনিবার , ১৬ মে ২০২৬
  • অন্যান্য
আজকের সর্বশেষ সবখবর

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যের স্বাদে আজও জনপ্রিয় বাকরখানি

admin
মে ১৬, ২০২৬ ১:৩৬ অপরাহ্ণ

Link copied !

পুরান ঢাকার সরু অলিগলি, পুরানো দালান আর ব্যস্ত জনজীবনের ভিড়ের মাঝেও আজও জীবন্ত হয়ে আছে শত বছরের সুস্বাদু এক ঐতিহ্য-বাকরখানি। সকাল হতেই পুরান ঢাকার বিভিন্ন গলি ভরে ওঠে সদ্য তৈরি গরম মচমচে বাকরখানির মিষ্টি ও লোভনীয় সুবাসে। সেই পরিচিত ঘ্রাণ যেন মুহূর্তেই মানুষকে ফিরিয়ে নেয় পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতির নস্টালজিক আবহে। সময় বদলেছে, নগরজীবনে যুক্ত হয়েছে নানা আধুনিক খাবার ও ফাস্টফুডের ছোঁয়া। তবে পুরান ঢাকার মানুষের কাছে বাকরখানি এখনও শুধু একটি খাবার নয়, এটি আবেগ, ঐতিহ্য ও আতিথেয়তার প্রতীকও।

পুরান ঢাকার নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বাহারি খাবারের পসরা, আর বাকরখানি যেন সেই ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান পরিচয় হয়ে আছে। শত বছরের পুরোনো এই খাবার পুরান ঢাকার সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে রয়েছে। ধনী, মধ্যবিত্ত কিংবা সাধারণ মানুষ – সব শ্রেণির মানুষের সকালের নাস্তায় এখনও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে বাকরখানি। এক কাপ গরম চায়ের সঙ্গে মচমচে বাকরখানি যেন এখানকার মানুষের প্রতিদিনের অভ্যাস। শুধু তাই নয়, বাড়িতে অতিথি এলে চায়ের সঙ্গে বাকরখানি পরিবেশন করার রেওয়াজও এখনও সমানভাবে প্রচলিত। দিন যতই বদলাক, বাকরখানির জনপ্রিয়তা ও কদর যেন সময়ের সঙ্গে আরও বেড়েই চলেছে।

যেভাবে তৈরি হয় বাকরখানি: প্রক্রিয়া শুরু হয় ময়দার খামির প্রস্তুতের মধ্য দিয়ে। ময়দার সঙ্গে পরিমাণমতো লবণ, চিনি, দুধ ও তেল মিশিয়ে রি করা হয় বিশেষ ধরনের খামির। অনেক কারিগর স্বাদ ও ঘ্রাণ বাড়াতে এতে দারুচিনি, এলাচ কিংবা কালোজিরার মতো মসলাও ব্যবহার করেন।এরপর খামির নির্দিষ্ট আকারে কেটে গোল কিংবা ডিম্বাকৃতির রূপ দেওয়া হয়। খামিরগুলো কাঠের পাটাতন বা থালায় সাজিয়ে বারবার তেল ও ময়দার আস্তরণ দেওয়া হয়। এই স্তর তৈরির কারণেই বাকরখানির ভেতরের গঠন বিশেষ খাস্তার মত। পরে মাটির তৈরি চুলায় কয়লার আঁচে ধীরে ধীরে তা বেক করা হয়।

মচমচে স্বাদের রহস্য: কারিগরদের মতে, মাটির চুলা ও কয়লার তাপই বাকরখানির আসল স্বাদ ও গন্ধের প্রধান রহস্য। প্রায় ৮ থেকে ১০ মিনিট ধরে বিশেষ তাপে বেক করার ফলে এর বাইরের অংশ মচমচে হয়, আর ভেতরে থাকে নরম স্তর।কয়লার আঁচে তৈরি হওয়ায় এতে আলাদা ধোঁয়াটে সুবাসও যুক্ত হয়, যা আধুনিক ওভেনে পুরোপুরি পাওয়া যায় না।

বিভিন্ন স্বাদের বাকরখানি: বর্তমানে বাজারে নানা ধরনের বাকরখানি পাওয়া যায়। এর মধ্যে পনির, তিল, মিষ্টি ও নোনতা বাকরখানি বেশ জনপ্রিয়। পনির ও তিলের বাকরখানি প্রতি কেজি প্রায় ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। মিষ্টি ও নোনতা বাকরখানির দাম তুলনামূলক কিছুটা কম। এছাড়া ছোট আকারের বাকরখানিও এখন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অনেক দোকানে উপহার হিসেবে বক্সজাত বাকরখানিও বিক্রি করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও বিদেশে থাকা স্বজজনদের কাছেও পুরান ঢাকার বাকরখানি পাঠানো হচ্ছে নিয়মিত।

নামকরণের পেছনের গল্প: জনশ্রুতি রয়েছে, মুঘল আমলে উপমহাদেশে বাকরখানির প্রচলন শুরু হয়। ধারণা করা হয়, বাংলার নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদে এর উৎপত্তি। একসময় এটি নবাব ও অভিজাত পরিবারের খাবার হিসেবে পরিচিত ছিল। লোককথায় বলা হয়, মির্জা আগা বাকের খান ও খানি বেগমের প্রেমকাহিনির সূত্র ধরেই ‘বাকরখানি’ নামের উৎপত্তি। যদিও ইতিহাসবিদদের মধ্যে এ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে, তবু এই গল্প এখনো মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত।

পুরান ঢাকা ছাড়িয়ে সর্বত্র: একসময় শুধুমাত্র পুরান ঢাকার নাজিরাবাজার, চকবাজার, নারিন্দা, বাংলাবাজার কিংবা লক্ষ্মীবাজার এলাকাতেই বাকরখানির দোকান দেখা যেত। এখন রাজধানীর তেজগাঁও, মিরপুর, খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকাতেও এটি সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। যদিও ঐতিহ্যবাহী বাকরখানি এখনও মাটির চুলাতেই তৈরি করা হয়, তবে বাড়তি চাহিদার কারণে অনেক কারখানায় আধুনিক ওভেনও ব্যবহার করা হচ্ছে। পুরান ঢাকার বাসিন্দা সোলাইমান হোসেন বাসস’কে বলেন, ‘বাকরখানি আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। সকালে চায়ের সঙ্গে কিংবা সন্ধ্যায় মিষ্টির সঙ্গে এটি খেতে খুব ভালো লাগে।

ছোটবেলায় চার আনা দিয়ে বাকরখানি খেয়েছি। এখন দাম বেড়েছে, কিন্তু এর জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে।’ আরেক ক্রেতা মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘বাকরখানি শুধু খাবার না, এটি আমাদের পুরান ঢাকার ঐতিহ্য। আগে মানুষ বিশেষভাবে পুরান ঢাকায় এসে বাকরখানি খেত। এখন ঢাকার অনেক জায়গায় পাওয়া গেলেও পুরান ঢাকার বাকরখানির স্বাদ আলাদা।’ নাজিরাবাজারের বাকরখানির কারিগর মোহাম্মদ সোহেল বলেন, ‘এটি আমাদের পারিবারিক পেশা। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকেই আমরা এই কাজ শিখেছি। এখনও পুরনো নিয়ম মেনেই বাকরখানি তৈরি করি। স্বাদ ও মান ধরে রাখার জন্য আমরা সবসময় যত্ন নিই।’