বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঠিক পূর্বে ২২টি পরিবারের কথা শুনা যাইত। উহার মধ্যে ১০টি ছিল পাকিস্তানি পরিবার এবং দুইটি ছিল পূর্ব পাকিস্তান, অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের পরিবার। সেই সময় যে দেশে ধনাঢ্য অন্য পরিবার ছিল না, তাহা নহে। তবে উল্লিখিত ২২টি পরিবারের একেকটির একাধিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ছিল, সম্পদের পরিমাণ ছিল তত্কালীন মুদ্রায় ৩ কোটি হইতে ৫ কোটি টাকা। এবং তাহারা আলোচনার কেন্দ্রে থাকার প্রধান কারণ ছিল অর্থসম্পদের কারণ তো বটেই, সেই সঙ্গে উহাদের একচেটিয়া বাণিজ্য প্রভাব। তাহার চাইতেও বড় কারণ, মানুষের ধারণা ছিল, এই ২২ পরিবার দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্য ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের সিংহভাগ কুক্ষিগত করিয়া রাখিয়াছিল।
ফলে স্বাধীনতার পূর্বাপর ২২ পরিবার একধরনের গালিতে পরিণত হইয়াছিল। কথায় কথায় ২২ পরিবারের উদাহরণ টানিয়া আনা হইত, এখনো হয়। কিন্তু স্বাধীনতার পর, বিশেষ করিয়া বর্তমান বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক আগাইয়াছে। অর্থনীতির হিসাব হইতে দেখা যায়, পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়, জাতীয় প্রবৃদ্ধি অনেকটাই আগাইয়া গিয়াছে। বাংলাদেশি মুদ্রার মান পাকিস্তানের মুদ্রার তুলনায় ঢের ভালো অবস্থানে রহিয়াছে। এখন ৫ কোটি টাকার সম্পৎশালী পরিবার, বিশেষ কোনো উল্লেখযোগ্য ধনী পরিবার হিসাবে বিবেচিত হয় না। এমনকি শতকোটি টাকার মালিকরাও হামেশাই বিচরণ করিতেছেন।
তাই অনেকে বলিয়া থাকেন, পাকিস্তানে ২২ পরিবার ছিল, এখন বাংলাদেশে ২২ হাজার পরিবার! কেহ কেহ লক্ষ পরিবারের কথা বলিয়া থাকেন। এবং তাহাদেরকে লক্ষ করিয়াই সাধারণ মানুষ নেতিবাচক দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া থাকে। কিন্তু আমরা এই ধারণার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি। মানুষের অর্থসম্পদ হওয়া কোনো নেতিবাচক বিষয় নহে। দেশের জন্যও তাহা শুভ খবর। কিন্তু যেই নেতিবাচক অর্থে ২২ পরিবারের কথা বলা হইত, এবং বর্তমানে ২২ হাজার পরিবারের কথা বলা হয়, সেই অর্থে বরং বাংলাদেশের সকল কিছু কুক্ষিগত করিবার পরিবারের সংখ্যা কমিয়াছে। হয়তো হাতেগোনা দুই-চারখানা। এমনকি একটি বা দুইটি বলিলেও অত্যুক্তি হইবে না। তবে পার্থক্য আছে পাকিস্তানের সঙ্গে।
এমন চিত্র যেই সকল দেশে রহিয়াছে, সেই সকল দেশে যাহারা এই রকম মোনোপলি হইতে হইতে সর্বভুক হইয়া উঠে, অক্টোপাসের মতো শুষিয়া লইবার প্রবণতা রাখে, তাহারা জানেন না, ঐ সকল দেশে ১ নম্বর ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না থাকিলে বিপদ যে কোনো সময় ঘনাইয়া আসিতে পারে। সেইখানে যদি খারাপ সময় আসে তাহা হইলে এক মিনিটও লাগিবে না অবস্থার পরিবর্তন হইতে। কারণ ১ নম্বর ব্যক্তি কোনো কারণেই তাহার ইমেজ নষ্ট করিতে পারেন না। যাহারা ২২ পরিবারের মতো থাকিতে চাহেন, যাহারা বিভিন্ন দেশে সরকারের জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে সকল কিছু ভক্ষণ করিতে চাহেন তাহাদের অবশ্যই মনে রাখা দরকার, সীমা লঙ্ঘনকারীকে শুধু আল্লাহই অপছন্দ করেন তাহা নহে, এমন দেশও আছে যাহা পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান ব্যক্তিও সীমা লঙ্ঘনকে স্তব্ধ করিয়া দিতে পারেন এক মুহূর্তেই। এই রকম দুই-একটি উদাহরণ আমরা সম্প্রতি দেখিয়াছি।
যাহার বা যেই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জনগণের ধারণা ‘সরকারের নিকটজন’ সেই প্রতিষ্ঠানকে কঠোর হস্তে আইনের পথে টানিয়া আনা হইয়াছে। সুতরাং পেশিশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সকল কিছু কুক্ষিগত করিবার এই প্রবণতা যে কোনো দেশের, যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। আমরা কেহই ভবিষ্যৎ জানি না। ‘আজকের রাজা, আগামী দিনের ফকির’ ইহা শুধু সান্ত্বনার কথা নহে, বহু দেশে বহুবার ‘রাজা’কে ফকির হইতে দেখা গিয়াছে। সকল কিছুতেই লাগাম টানিয়া ধরিবার প্রয়োজন পড়ে। লাগাম নিয়ন্ত্রণহীন হইলে বিপদের ঝুঁকি অধিক হইয়া থাকে ইহা বুঝিতে কাহারো কষ্ট হইবার কথা নহে।







