যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার নিজ দলের ভেতর থেকেই পদত্যাগের চাপের মুখে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যেই বুধবার জাঁকজমকপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতায় তার সরকারের আইন প্রণয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরেন রাজা তৃতীয় চার্লস। রাজকীয় ঐতিহ্যে ভরপুর এই ভাষণকে লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকে সাময়িক বিরতি হিসেবে দেখা হচ্ছিল। সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে ভরাডুবির পর অজনপ্রিয় স্টারমারের পদত্যাগ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলটির ভেতরে প্রকাশ্য সংঘাত শুরু হয়েছে। তবে ভাষণ শুরুর ঠিক আগে ব্রিটিশ গণমাধ্যম জানায়, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের ঘনিষ্ঠরা বলেছেন, তিনি স্টারমারের বিরুদ্ধে নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
মঙ্গলবার চারজন জুনিয়র মন্ত্রী পদত্যাগ করলেও এবং স্টারমারের পদত্যাগ দাবিকারী এমপির সংখ্যা ৮০ ছাড়ালেও তাৎক্ষণিক সংকট এড়াতে সক্ষম হন প্রধানমন্ত্রী। কারণ, নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ কেউ নেননি। বুধবার কিংস স্পিচের আগে স্টারমার ডাউনিং স্ট্রিটে স্ট্রিটিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম এটিকে ‘চূড়ান্ত মোকাবেলা’ হিসেবে বর্ণনা করলেও বৈঠকটি ২০ মিনিটেরও কম সময় স্থায়ী হয় এবং কোনো মন্তব্য না করেই স্ট্রিটিং সেখান থেকে বেরিয়ে যান। লেবার পার্টির ডানপন্থী অংশে স্ট্রিটিং জনপ্রিয় হলেও বামপন্থী এমপিরা সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী অ্যঞ্জেলা রায়নার অথবা গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডজ বার্নহ্যামকে নেতা হিসেবে দেখতে চান।
তবে নেতৃত্বের দৌড়ে নামতে তাদের উভয়েরই কিছু বাধা রয়েছে। এদিকে প্রায় ১১০ জন লেবার এমপি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সমর্থন জানিয়ে এক বিবৃতিতে বলেন, এখন নেতৃত্ব পরিবর্তনের সময় নয়। স্টারমারের ঘনিষ্ঠদের আশা, দলের এই গভীর বিভক্তিই তাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করবে। তবে বুধবার তিনি আরও বড় ধাক্কা খান, যখন লেবার পার্টিকে সমর্থন দেওয়া এবং দলীয় সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখা ট্রেড ইউনিয়নগুলো নতুন নেতা নির্বাচনের পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানায়। ১১টি ইউনিয়নের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন টিইউএলও জানায়, ‘এটা পরিষ্কার যে প্রধানমন্ত্রী আগামী নির্বাচনে লেবারকে নেতৃত্ব দেবেন না।’ পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন ২০২৯ সালের আগে হওয়ার কথা নয়। নামের সঙ্গে ‘কিং’ থাকলেও কিংস স্পিচ রাজা লেখেন না; এটি সরকার প্রস্তুত করে এবং আগামী ১২ মাসে তারা কোন কোন আইন প্রণয়ন করতে চায়, তা এতে তুলে ধরা হয়।
ভাষণের সূচনাপত্রে স্টারমার প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি আরও ‘জরুরি ভিত্তিতে’ কাজ করবেন, যাতে ব্রিটেনকে ‘আরও শক্তিশালী ও ন্যায়সঙ্গত’ করা যায়। তার প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করা এবং ইৎরঃরংয ঝঃববষ পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়া। সরকারের অন্যান্য পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে আশ্রয়প্রার্থী ব্যবস্থা সংস্কার, ভোট দেওয়ার বয়স কমিয়ে ১৬ বছর করা এবং টিকিট কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে, স্টারমার এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আদৌ ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবেন কি না। লেবার পার্টির নিয়ম অনুযায়ী, নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রতিযোগিতা শুরু করতে স্ট্রিটিংয়ের প্রয়োজন হবে ৮১ জন লেবার এমপির সমর্থন, যা পার্লামেন্টে দলটির মোট এমপির ২০ শতাংশ।
স্টারমার যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ঘোষণা দিয়েছেন। বার্নহাম বর্তমানে এমপি নন, তাই তিনি এখনই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছেন না। তার সমর্থকেরা চান, স্টারমার যেন পদত্যাগের একটি সময়সূচি ঘোষণা করেন, যাতে বার্নহাম পার্লামেন্টে ফিরে এসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। অন্যদিকে রেইনার এখনো একটি জটিল বকেয়া কর-সংক্রান্ত ইস্যু সামলাচ্ছেন। রাজা চার্লস পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ হাউস অব লর্ডসে সোনালি সিংহাসনে বসে স্টারমারের কর্মসূচি তুলে ধরেন। এ সময় তিনি হিরাখচিত ‘ইম্পেরিয়াল স্টেট ক্রাউন’ ও লম্বা গাঢ় লাল রাজকীয় পোশাক পরেছিলেন। দিনের কার্যক্রম শুরু হয় রাজপ্রাসাদের নিরাপত্তারক্ষীদের মাধ্যমে পার্লামেন্ট ভবনের নিচতলায় বিস্ফোরক অনুসন্ধানের ঐতিহ্যবাহী প্রথা দিয়ে।
১৬০৫ সালের ব্যর্থ ‘গানপাউডার ষড়যন্ত্রে’ ক্যাথলিকদের পার্লামেন্ট উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টার স্মৃতি থেকেই এ প্রথা চালু রয়েছে। এরপর রাজা ঘোড়সওয়ার অশ্বারোহী বাহিনীর পাহারায় বাকিংহাম প্রাসাদ থেকে ঘোড়ার গাড়িতে করে পার্লামেন্টে যান। প্রথা অনুযায়ী, রাজার নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে একজন এমপিকে প্রতীকীভাবে ‘জিম্মি’ হিসেবে প্রাসাদে রাখা হয়। ‘ব্ল্যাক রড’ নামে পরিচিত এক পার্লামেন্ট কর্মকর্তা হাউস অব কমন্সের দরজায় পৌঁছালে তার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এটি রাজতন্ত্রের বিপরীতে পার্লামেন্টের স্বাধীনতার প্রতীকী রীতি। এরপর এমপিরা ব্ল্যাক রডকে অনুসরণ করে উচ্চকক্ষে যান, যেখানে চার্লস লাল ও পশমখচিত পোশাক পরা লর্ড-লেডি এবং আমন্ত্রিত কমন্স সদস্যদের সামনে ভাষণ দেন।







