ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেছেন, সরকার বাংলাদেশকে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারকারী নয়, বরং প্রযুক্তি উৎপাদনকারী, রপ্তানিকারক এবং উদ্ভাবন নির্ভর দেশে রূপান্তর করতে চায়। বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতকে সরকার নতুন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। মন্ত্রী বলেন, ‘সরকার এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চায় যেখানে প্রযুক্তি কেবল ব্যবহৃত হবে না, বরং এআই, হার্ডওয়্যার, সেমিকন্ডাক্টর, সফটওয়্যার, বিপিও, সার্ভার সিকিউরিটি, ডেটা সেন্টার, স্টার্টআপ ও ডিজিটাল সার্ভিসের মাধ্যমে প্রযুক্তি উৎপাদন, সেবা প্রদান ও রপ্তানিতে দৃশ্যমান অবস্থান তৈরি করবে।’ ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের উদ্যোগে বিটিআরসি অডিটোরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি উদযাপন করা হয়।
এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘ডিজিটাল জীবনধারা : সংযোগে স্থিতি, সহনশীলতায় শক্তি’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ডিজিটাল সংযোগ কেবল উন্নয়নের সহায়ক নয়, বরং জাতীয় অগ্রগতি, উৎপাদনশীলতা, জনসেবা ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার অন্যতম ভিত্তি। মন্ত্রী বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে সরকারের প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে-এআই হার্ডওয়্যার হাব গঠন, ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সবার জন্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট নিশ্চিতকরণ, সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার শিল্প সম্প্রসারণ, জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা জোরদার, এআই-চালিত ডেটা সেন্টার নির্মাণ, ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব নিশ্চিতকরণ, স্টার্টআপ ইনোভেশন ফান্ড গঠন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ক্যাশলেস অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা। তিনি বলেন, ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’, ‘অ্যাসেম্বলি ইন বাংলাদেশ’ এবং ‘সার্ভিসড ইন বাংলাদেশ’ শুধু স্লোগান নয়, বরং উৎপাদন সক্ষমতা, স্থানীয় উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় প্রবেশের রূপরেখা।
ডিজিটাল অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, দেশে বর্তমানে ১৮.৮৪ কোটি মোবাইল ফোন সংযোগ ও ১৩.৩৬ কোটি ইন্টারনেট গ্রাহক রয়েছে। দেশের ৯৯ শতাংশ জনগোষ্ঠী ইতোমধ্যে ৪জি নেটওয়ার্ক কভারেজের আওতায় এসেছে। মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে এখন কেবল সংযোগ বিস্তার নয়, সংযোগকে আরও নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই ও দুর্যোগসহনশীল করতে হবে। দুর্যোগপ্রবণ দেশের প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, ডিজিটাল অবকাঠামোর স্থিতিস্থাপকতা জাতীয় নিরাপত্তা ও জনকল্যাণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। টেলিযোগাযোগ ও ডিজিটাল সিস্টেম এমনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে যাতে সংকট, দুর্যোগ বা সাইবার জরুরি অবস্থায় সেবা ভেঙে না পড়ে। তিনি একটি জাতীয় ডিজিটাল রেজিলিয়েন্স ফ্রেমওয়ার্ক প্রণয়নের কথা উল্লেখ করেন, যার আওতায় থাকবে যোগাযোগ নেটওয়ার্ক, সাবমেরিন ও টেস্ট কেবল, স্যাটেলাইট ব্যাকআপ, ডেটা সেন্টার, ক্লাউড অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা, জরুরি টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিকল্প ডিজিটাল সিস্টেম।
মন্ত্রী গ্রাম, চর, উপকূলীয় ও পাহাড়ি এলাকার মানুষসহ সকলের জন্য দ্রুত, নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল সেবা নিশ্চিতের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, ডিজিটাল উন্নয়ন সফল হবে তখনই যখন এর সুফল শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, আর্থিক সেবা, বাণিজ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সেবার প্রতিটি স্তরে পৌঁছাবে। মন্ত্রী সার্ভার নিরাপত্তা, নাগরিক তথ্যের সুরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যবহার, গবেষণা ও উদ্ভাবন, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং তরুণদের জন্য প্রযুক্তি নির্ভর বাণিজ্যিক সুযোগ সৃষ্টির ওপরও গুরুত্ব দেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন এবং আইসিটি বিভাগের সচিব কাজী আনোয়ার হোসেন। সভাপতিত্ব করেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব বিলকিস জাহান রিমি।
প্রধানমন্ত্রীর টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বলেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ২০ ডিজিটাল অর্থনীতির মধ্যে এবং পরবর্তী ১০ বছরে শীর্ষ ১০ ডিজিটাল অর্থনীতির মধ্যে অবস্থান অর্জন করতে চায়। তিনি জানান, মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড গ্রাহক সংখ্যায় বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ২০ দেশের একটি হলেও সেবা মান, নির্ভরযোগ্যতা ও প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এখনো পিছিয়ে আছে। তিনি বলেন, ব্রডব্যান্ড প্রবেশাধিকার প্রতি ১০ শতাংশ বাড়লে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ১.৩ শতাংশ বাড়ে, অথচ বর্তমানে দেশের মোবাইল ডেটা ব্যবহার মাত্র ৫০ শতাংশ। ‘আমাদের দেশের দ্রুত উন্নয়নে এই খাতের মতো বড় ভূমিকা অন্য কোনো খাত রাখতে পারবে না,’ উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, উন্নত ব্রডব্যান্ড, অধিক নির্ভরযোগ্যতা, উন্নত ডেটা সেন্টার এবং এআই-চালিত অবকাঠামো আগামী পাঁচ বছরে জিডিপিতে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ অবদান রাখতে পারে।
তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরে দেশের সেরা ৫জি ও ফাইবার ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক নির্মাণ এবং রাজধানী ও গ্রামীণ অঞ্চলের ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে হবে। বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদুল বারী স্বাগত বক্তব্যে বলেন, প্রযুক্তি নির্ভর সমাজে বাস্তব সমস্যার সমাধান ও ডিজিটাল স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তুলতে উদ্ভাবন অপরিহার্য। তিনি জানান, এ বছরের প্রতিপাদ্য ডিজিটাল লাইফলাইনগুলোর স্থিতিস্থাপকতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে, যাতে একটি সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো সেবা ভেঙে না পড়ে। স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক, এয়ারক্রাফট ন্যাভিগেশন সিস্টেম ও হাইপার ডেটা সেন্টারের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সৌরঝড় বা ভূমিকম্পের মতো কারণে এসব সেবায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে, ফলে স্থিতিস্থাপকতা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, যে দেশগুলো উদ্ভাবন প্রধান শক্তি নয়, তাদের বাস্তব সমস্যার সমাধানে প্রযুক্তি অভিযোজন ও উদ্ভাবনে জোর দিতে হবে। তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে তিনি বলেন, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারই উদ্ভাবনের উদ্দেশ্য নয়; বরং বাস্তব সমস্যার সমাধানই প্রকৃত উদ্ভাবন। তিনি তরুণদের সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘একটি সমস্যা খুঁজে বের করো। সেই সমস্যার সমাধানের মধ্যেই তোমার জীবনের সমাধান লুকিয়ে রয়েছে।’ অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ ও অন্যান্য প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। দিবসটি উপলক্ষে বিটিআরসিতে টেলিকম মেলারও আয়োজন করা হয়।







