৭১-এর বিজয়গাথা অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আমরা স্বাধীনতার ৫১ বছর অতিক্রম করতে চলেছি। এই অর্ধশতাব্দীতে আমরা অনেক কিছু পেয়েছি, আবার অনেক কিছু পাইনি। এর বিচারের ভার পাঠকের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হলো। বাঙালি জাতির ওপর বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ, বৈষম্য, মাতৃভূমির ইতিহাস এখনো আমাদের কাছে উজ্জ্বল হয়ে আছে। পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যের মাত্রা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। বৈষম্যের মাত্রা অবসানের নিমিত্তে ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত আরটিসি সম্মেলনে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তির সনদ হিসেবে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এতে ক্ষুব্ধ হন এবং ফলে শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। গণগ্রেফতারের প্রতিবাদে এবং ছয় দফা দাবির সমর্থনে সমগ্র দেশ আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে। পক্ষান্তরে পাকিস্তানের শাসকেরা এই ছয় দফাকে মনে করতেন ‘বিচ্ছিন্নতাবাদের ছদ্ম দলিল’। ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের ফলে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি প্রবল গণ-আন্দোলনের চাপে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করা হয়। জননেতা শেখ মুজিবুর রহমান, লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন, আহমেদ ফজলুর রহমান সিএসপি, রুহুল কুদ্দুস সিএপি, স্টুয়ার্ড মুজিবর রহমান, ক্যাপ্টেন শওকত আলী, ক্যাপ্টেন নুরুজ্জামানসহ ৩৪ জন রাজবন্দিকে সম্মানের সঙ্গে মুক্তি দেওয়া হয়।
১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পদত্যাগে বাধ্য হন। জেনারেল ইয়াহিয়া খান সামরিক আইন জারি করেন এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। পাকিস্তানের ইতিহাসে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রথম ও শেষ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমেদের বক্তব্য অনুযায়ী জাতীয় সংসদের ১৬২ আসনের জন্য মোট আবেদনপত্র পাওয়া যায় ৩৫৯টি (সূত্র:বিবিসি বাংলা নিউজ)। উক্ত জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি+সাতটি মহিলা আসন = ১৬৭টি আসন লাভ করে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর মধ্যে প্রায় ৪৮ শতাংশ আইনজীবী, ১৯ শতাংশ ব্যবসায়ী এবং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ অন্যান্য ৩৩ শতাংশ ছিল। পক্ষান্তরে পশ্চিম পাকিস্তানে (উল্লেখ্য, পশ্চিম পাকিস্তানকে মোট চারটি প্রদেশে বিভক্ত করা হয়) ১৩৮ আসনের মধ্যে পাকিস্তান পিপলস পার্টি মহিলা আসনসহ মোট ৮৮টি আসন পায়। ১৭ ডিসেম্বর, পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসন লাভ করে। পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি পার্টির সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের পার্লামেন্টারি পার্টির লিডার এবং প্রাদেশিক পার্লামেন্টারি বোর্ডের সভায় এম মনসুর আলীকে পূর্ব পাকিস্তানের পার্লামেন্টারি পার্টির লিডার নির্বাচিত করা হয়। ’৭০-এর নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী শেখ মুজিবর রহমান পাকিস্তানের ভাবী প্রধান মন্ত্রী এবং এম মনসুর আলী পূর্ব পাকিস্তানের ভাবী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বিবেচিত হতে থাকেন।
মুক্তিযুদ্ধ ষড়যন্ত্র চলতে থাকার একপর্যায়ে ১৯৭১ সালের ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান দুপুর ১.১৫ মিনিটে রেডিও পাকিস্তানে ৩ মার্চ আহূত জাতীয় সংসদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। ঢাকা স্টেডিয়ামে চলমানরত পাকিস্তান ও এমসিসি ক্রিকেট খেলা অকস্মাত্ বন্ধ হয়ে যায়। হাজার হাজার দর্শক, ছাত্র, জনতা রাস্তায় নেমে আসে এবং বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ৩ মার্চ পল্টনের মহাসমাবেশে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা হয়। উক্ত সভায় আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিব অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলনের আহ্বান জানান এবং জনগণের প্রতি খাজনা, ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ পড়ন্ত বিকালে তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দান জনতার মহাসমুদ্রে স্বাধীনতার আন্দোলনের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দৃপ্ত পায়ে মঞ্চে উঠলেন এবং হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ কবিতাখানা পাঠ করলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থা মূলত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই পরিচালিত হয়। ঐতিহাসিক ভাষণের পর, ঢাকা তথা সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিতে রূপান্তরিত হয়। এ সময় পাকিস্তান এয়ারফোর্সের হেলিকপ্টার আকাশে টহল দিচ্ছিল। খ্যাতিমান আন্তর্জাতিক নিউজ ম্যাগাজিন নিউজইউক ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল সংখ্যার প্রচ্ছদ স্টোরিতে বঙ্গবন্ধুকে ‘রাজনীতির কবি’ বলে অভিহিত করে।
ঢাকায় পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির লিডার ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনার নাটক ব্যর্থ হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে ঢাকা ত্যাগ করেন। জেনারেল রাওফরমান আলীর নেতৃত্বে ঢাকায় এবং জেনারেল খাদিমের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনাসহ মোট ১০টি শহরে ২৫ মার্চ রাত ১১.৩০ মিনিটে অপারেশন সার্চলাইট শুরু করা হয়। ঢাকায় রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ইপিআর হেডকোয়ার্টার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, তদানীন্তন ইকবাল হল মূল টার্গেটে পরিণত হয়। হাজার হাজার নিরস্ত্র বাঙালি ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, যা ছিল বিশ্বের ইতিহাসে এক বর্বরোচিত গণহত্যা। ২৬ মার্চ ০০:২০ মিনিটে পাকিস্তান পার্লামেন্টের মেজরিটি পার্টির লিডার আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন—‘ইহাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন…।’ পাকিস্তান আইএসপিআরের পিআরও মেজর সালিক সিদ্দিকের ওয়্যারলেসে ঘোষণাটি শুনতে পাওয়া যায়। রাত ১:৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের নিজ বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। এর কয়েক মিনিটের মধ্যে ওয়্যারলেসে ৫৭ ব্রিগেডের মেজর জাফর জানায়, ‘বিগ বার্ড ইন দ্য কেজ, অন্য পাখিরা নীড়ে নেই, ওভার’ (সূত্র :উইটনেস টু স্যারেন্ডার; লেখক : সালিক সিদ্দিক)।
অতঃপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা থেকে রাওয়ালপিন্ডির লয়ালপুর জেলে স্থানান্তর করা হয়। প্রখ্যাত সাংবাদিক সায়মন ড্রিংকসই প্রথম ২৫ মার্চের পরিকল্পিত গণহত্যার খবরটি ‘ওয়াশিংটন পোস্টের’ মাধ্যমে সমগ্র বিশ্ববাসীকে অবহিত করেন। প্রখ্যাত সাংবাদিক ম্যাসকারেনহাস ১৯৭১ সালের ১৫ জুন ঢাকাসহ সমগ্র দেশের বর্বরোচিত গণহত্যার ভয়াবহ চিত্র ‘সানডে টাইমস’-এ তুলে ধরেন। উক্ত হূদয়বিদারক রিপোর্টটি পাশ্চাত্য তথা সমগ্র বিশ্ববিবেককে নাড়া দেয় এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। উল্লিখিত রিপোর্টটি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হূদয়কে গভীরভাবে নাড়া দেয়, তার ফলে ভারত সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সশস্ত্র হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। মুক্তিযোদ্ধা ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট বলে বিবেচিত হয়। ১০ এপ্রিল এক বিশেষ অধিবেশনে ১৯৭০ সালের নির্বাচিত জাতীয় পরিষদের ১৬৭ সদস্য এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত ২৯৮ সদস্যের সমন্বয়ে গণপরিষদ গঠন করা হয়। উক্ত অধিবেশনে ২৬ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত ‘প্রক্লেমেশন অব ইনডিপেনডেন্স’ (স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র) অনুমোদন করা হয়, যা অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান হিসেবে গণ্য করা হলো। উক্ত সংবিধান ৪০৪ জন গণপরিষদ সদস্য কর্তৃক স্বাক্ষরিত হয়, যার মূলভিত্তি হচ্ছে সাম্য, সামাজিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের বিশেষ অধিবেশনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ও সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করা হয়। এম মনসুর আলী অর্থমন্ত্রী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব অপর্ণ করা হয়। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাননে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকের উপস্থিতিতে উল্লিখিত সরকারের মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত ‘মুজিবনগর সরকার’ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে প্রথম গণতান্ত্রিক ও আইনানুগ সরকার। এমএজি ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং এম এ রবকে চিফ অব আর্মি স্টাফ নিয়োগ দেওয়া হয়। সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয় এবং ১১ জন সেক্টর কমান্ডার নিয়োগ দেওয়া হয়। মুজিবনগর সরকারের মেয়াদকাল ছিল ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল থেকে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি। ‘৭১-এ মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার গোপনে চীন সফর করেন। চীন-মার্কিন সম্পর্ক উন্নয়নে পাকিস্তান মধ্যস্থতা করে। ফলে ১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট ২০ বছরমেয়াদি ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়ন মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যাহা সহায়ক শক্তি হিসেবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অবস্থান সুসংহত করে। হিমালয়ের তুষার ও সোভিয়েতের বন্ধুত্ব—এই দুটি ছিল চীনের বিরুদ্ধে ভারতের রক্ষাকবচ। পর্বত প্রমাণ কফিনের নিচে অখণ্ড পাকিস্তানের কবর রচিত হয়। ৩০ লাখ শহিদের তাজা তপ্ত রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা উপাখ্যানের পশ্চােত রয়েছে মুজিবনগর সরকারের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্ব।
দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ শহিদের তাজা তপ্ত রক্ত এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ নিয়াজির নেতৃত্বে পাকিস্তানের ৯৩ হাজার সেনা অস্ত্রশস্ত্রসহ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরা ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপপ্রধান এ কে খন্দকারের উপস্থিতিতে বিকাল ৪:৩১ মিনিটে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন। উক্ত দলিলে জেনারেল অরোরা প্রতিস্বাক্ষর করেন। বিশ্বের মানচিত্রে ‘বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। লেখক: প্রাক্তন সাংগঠনিক সম্পাদক জাতীয় চার নেতা পরিষদ। ইত্তেফাক/কেকে বিষয়: বিজয় দিবস এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন বিজয় দিবস দেশপ্রেম ও চেতনার জাগ্রত মঞ্চ বিজয় দিবস দেশপ্রেম ও চেতনার জাগ্রত মঞ্চ মহান স্বাধীনতাসংগ্রামে আমাদের সম্পৃক্ততা মহান স্বাধীনতাসংগ্রামে আমাদের সম্পৃক্ততা বিজয়ের পরিপূর্ণতা ও বঙ্গবন্ধু বিজয়ের পরিপূর্ণতা ও বঙ্গবন্ধু বিজয় দিবস দেশপ্রেম ও চেতনার জাগ্রত মঞ্চ অধ্যাপক ড. মো. নাছিম আখতার প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:৩৮ ৩০ লাখ শহিদের রক্তের বিনিময়ে দীর্ঘ ৯ মাস অবরুদ্ধ বাংলার সব অর্গল খুলেছিল একাত্তরের এই দিনে। উন্মুক্ত নীলাভ আকাশ আর সুনীল সমুদ্রের মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিয়েছিল সাড়ে ৭ কোটি বাঙালি। তাই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের মাথা উঁচু করার দিন। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্র্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। সেটির পুনরুদ্ধার ঘটে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর।
এই বিজয়ের মহানায়ক হিসেবে যিনি ইতিহাসের চির অম্লান ও ভাস্বর হয়ে আছেন, তিনি হলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরপরই শুরু হয় বাঙালির ওপর পশ্চিম পাকিস্তানিদের নির্যাতন। রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামজিক-সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনের ওপর তারা হস্তক্ষেপ শুরু করে। দুর্বিষহ হয়ে ওঠে নিরীহ বাঙালির জীবন। বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতার ওপর পাক জান্তাদের নগ্ন হস্তক্ষেপ বাঙালিদের জীবন বিষিয়ে তোলে। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনে বাংলার সূর্যসন্তান সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বার প্রমুখ ছাত্রনেতাদের বুুকের রক্তে রঞ্জিত হয় বাংলার রাজপথ। উত্তাল হয়ে ওঠে সমগ্র পূর্ববাংলা। অবশেষে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাধ্য হয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়। কিন্তু নির্যাতন ও শোষণের মাত্রা বেড়ে যায় বহুগুণ। তাদের বিমাতাসুলভ আচরণে দেশবাসী অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে, জন্ম নেয় চাপা ক্ষোভ। বিদ্রোহী হয়ে ওঠে সমগ্র পূর্ব বাংলার মানুষ। ১৯৬৯-এর বিদ্রোহ গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচন সব পরিণতিকে দেয় চূড়ান্ত রূপ। শুরু হয় নতুন অধ্যায়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে আসে বঙ্গবন্ধুর বজ্র-নিনাদ ঘোষণা ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে ইয়হিয়া খান বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দেয়। ২৬ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীর অতর্কিত হামলায় বাংলার মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। সারা দেশ জুড়ে চলে ধ্বংসের তাণ্ডবলীলা।
বাঙালি জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তি সংগ্রামে। অবশেষে সুদীর্ঘ ৯ মাস এক রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাঙালির চির কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য উদিত হয়। পৃথিবীর সব স্বাধীন দেশে স্বাধীনতা দিবস থাকলেও বিজয় দিবস থাকে না। বাংলাদেশ সেই বিরল সৌভাগ্যের অধিকারী দেশ। মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি গৌরবময় বিজয় ৫১ বছর অতিক্রম করছে। ইতিহাসের মহাসমুদ্রে এটা খুব দীর্ঘসময় না হলেও একটি জাতির উন্নয়ন অগ্রগতির জন্য সময়টা একেবারে কম নয়। স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগে, যে লক্ষ্য ও আদর্শকে সামনে রেখে মুক্তিযুুদ্ধ করেছিল বাঙালিরা, সেই লক্ষ্য ও আদর্শ কতটা অর্জিত হয়েছে? স্বাধীনতার পর দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেলেও তা হোঁচট খেয়েছে বারবার। বজায় থাকেনি তার ধারাবাহিকতা। রাজনীতিতে ঐকমত্যের অভাব ও অসহিষ্ণুতা এর বড় কারণ। অন্তত জাতীয় ইস্যুগুলোয় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ঐক্য থাকা প্রয়োজন হলেও কোনো শাসনামলেই তা দেখা যায়নি। এ ক্ষেত্রে দেশের চেয়ে দলের স্বার্থই হয়ে উঠেছে মুখ্য। একইভাবে সরকার পরিবর্তনের পর আগের সরকারের উন্নয়নমূলক কাজ থমকে গেছে। এটা দেশের অগ্রগতির পথে হয়েছে অন্তরায়। এটা সত্যি—দারিদ্র্যবিমোচন, শিক্ষার প্রসার, নারী উন্নয়ন, শিশুমৃত্যুর হার কমানো ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রভূত সাফল্য রয়েছে আমাদের। জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিলেও এর উত্থান ঠেকিয়ে রাখা গেছে। আশার কথা হলো, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ এখন বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিচ্ছে। রাজনীতির দ্বিধাদ্বন্দ্ব, টানাপোড়ন কাটিয়ে মহাজোট সরকার দেশকে একাত্তরের চেতনায় পরিচালিত করার ব্যাপারে সংকল্পবদ্ধ।
ইতিহাসের এই নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে গিয়ে আমাদের নতুন প্রজন্মকে এটাও বুঝতে হবে যে, স্বাধীনতা মানে শুধু পরাধীনতা থেকে মুক্তি নয়। নতুন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আয়োজনও শুধু নয়। স্বাধীনতা হলো স্বাধীন রাষ্ট্রে সার্বভৌম জাতি হিসেবে টিকে থাকার আয়োজন। স্বাধীনতা মানে বৈধ ও নৈতিক ইচ্ছার স্বাধীনতা। রাজনীতির স্বাধীনতা এবং অবশ্যই অর্থনৈতিক মুক্তি। বর্তমান সরকারের গতিশীল ও পরিকল্পিত চিন্তাধারার মাধ্যমে দেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। নিজের দেশের পণ্যের বিজ্ঞাপন যখন ভিনদেশি টেলিভিশনের পর্দায় দেখা যায়, তখন মানুষ হিসেবে মনটা খুশিতে ভরে ওঠে। যখন শুনি আমাদের তৈরি ওষুধ পৃথিবীর ১০৪ টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে, তখন গর্ববোধ করি। যখন দেখি নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মিত হয়েছে। তখন ভালো লাগার মাত্রায় যোগ হয় এক অনির্বচনীয় গর্ব ও প্রত্যাশা। আগামীর সম্ভাবনাময় চোখে যখন দেখি আমাদের আইটি সেক্টর গার্মেন্টস সেক্টরকেও পেছনে ফেলবে, তখন বিস্ময়ে অভিভূত হই। কৃষিতে শাকসবজি, ফলমূল উত্পাদনে আমাদের সমকক্ষ দেশ পৃথিবীতে খুবই কম। কখনো কখনো খাদ্যে ভেজাল, নারী ও শিশু নির্যাতন, কর্মক্ষেত্রে দুর্নীতি, চাকরিতে নিয়োগে অস্বচ্ছতা ও বিদেশে টাকা পাচারসহ বহু নেতিবাচক কার্যকলাপ আমাদের সোনার বাংলার এই ইতিবাচক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। আমরা উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া শুরু করলেও কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের অগোচরেই থেকে যাচ্ছে। তা হচ্ছে জীবন ও কর্মক্ষেত্রে আমাদের দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও উপলব্ধিবোধের অভাব। ‘উপলব্ধিবোধ’ শব্দটি এজন্য ব্যবহার করলাম যে, কখনো কি আমরা দেশমাতৃকার দিকে সন্তানের দৃষ্টি নিয়ে গভীর মমতা ভরা চোখে চেয়ে দেখেছি? দেখলে দেখতাম আমাদের মাতৃভূমি প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের বিপুল সম্ভাবনার সমাহার।
পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ আছে যেখানে দিনের বেলায় খোলা জায়গায় ডিম রাখলে ডিম সিদ্ধ হয়ে যায়। আবার এমন অনেক দেশ আছে যেখানে শীতে বরফ পড়ে। হিটিং সিস্টেম ছাড়া জীবন ধারণ দুরূহ। সে দিক থেকে বলা যায়, ঋতু-বৈচিত্র্য আমাদের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, ঠিক তেমনি সমৃদ্ধ করেছে। এ দেশে জন্মে নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাবতে পারাটাও গভীর উপলব্ধিবোধের বিষয়। পরিবার, সমাজ, জাতি যখন দেশপ্রেমিক। যখন জাতি সততা ও নৈতিকতার চর্চা করবে তখন দেশের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে থাকবে প্রাণ, প্রাচুর্য ও বিজয়ের ছোঁয়া। বিজয় মাসের শপথ হোক, বৈরিতা-বিদ্বেষকে পেছনে ফেলে দেশ ও জনগণের কল্যাণে সবাই এক হয়ে মিলেমিশে কাজ করা। আনন্দ অনেকভাবেই আসতে পারে জীবনে। কিন্তু মাতৃভূমির পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্তির জন্য প্রাণোত্সর্গ করা যুদ্ধজয়ের আনন্দের কোনো তুলনা হয় না। আগামী প্রজন্মের মন ও মননে মহান বিজয় দিবসের তাত্পর্য ও গুরুত্বের বীজ বপন করতে হবে। এভাবেই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জাগ্রত হবে দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। লেখক: উপাচার্য, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ইত্তেফাক/কেকে বিষয়: বিজয় দিবস এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন মহান স্বাধীনতাসংগ্রামে আমাদের সম্পৃক্ততা মহান স্বাধীনতাসংগ্রামে আমাদের সম্পৃক্ততা বিজয়ের পরিপূর্ণতা ও বঙ্গবন্ধু মহান স্বাধীনতাসংগ্রামে আমাদের সম্পৃক্ততা কাজী সেলিম প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০২২, ১১:৩৬ মহান স্বাধীনতাসংগ্রামে আমাদের সম্পৃক্ততা মাদারীপুর জেলার সর্বোদক্ষিণ প্রান্তে কালকিনি থানার অন্তর্গত গোপালপুর গ্রাম অবস্থিত। বরিশাল-ফরিদপুর মহাসড়কটি ভূরঘাটা বাজার থেকে উত্তরে মাদারীপুর ও ফরিদপুরের দিকে প্রসারিত।
আমাদের কালকিনি-ভূরঘাটা সীমান্তের দক্ষিণেই অবস্থিত বরিশালের গৌরনদীর ভূরঘাটা বাজার, একটি সেতু দুই জেলার সংযোগের প্রতীক বা সীমানা হিসেবে বিদ্যমান। ১৯৭১ সনের ৭ই মার্চের বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত জাতিয় সংগ্রামী নেতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ঘোষিত ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।…তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে’—এই উদাত্ত আহ্বানে অনুপ্রাণিত ও উদ্বুদ্ধ হয়ে, বিদ্যুত্ বেগে সাড়া দিয়ে পার্শ্ববর্তী বরিশালের গৌরনদী মহাবিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে আমি ও আমার অগ্রজ, বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী সবুর (ফরহাদ), মরহুম কাজী সাইদুর রহমান (শহীদ) বীর মুক্তিযোদ্ধা, সৈয়দ ফারুক রহমান বীর মুক্তিযোদ্ধা, মরহুম কাজী জাহিদুর রহমান মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ আরো কতিপয় গোপালপুরের তেজস্বী কৃতী সন্তানরা মাদারীপুর মহকুমার জনপ্রিয় সর্বশ্রদ্ধাভাজন প্রবীণ নেতা, মৌলভী আছমত আলী খান সাহেবের নের্তৃত্ব ও নির্দেশনায় এবং কালকিনির কৃতী সন্তান, সংগ্রামী জননেতা মরহুম আব্দুল আজিজ সরদারের নেতৃত্বে সংগঠিত হয়ে জনসভার কার্যক্রম শুরু করেছিলাম। ২৫শে মার্চ ১৯৭১-এর বিকালে আমি আমার একমাত্র বোনের ও আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় দুলাভাই জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ ও ঘনিষ্ঠ সহচর, মহান মুক্তি সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক ৭০-এর নির্বাচনে নির্বাচিত এমএনএ ও ৭৩-এ নির্বাচিত এমপি মরহুম আবিদুর রেজা খান (অ্যাডভোকেট) সাহেবের একমাত্র কন্যা, আমাদের ভাগনিকে নিয়ে টরকী বন্দর থেকে লঞ্চযোগে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা করেছিলাম, উদ্দেশ্য স্কুলে পড়ুয়া ভাগনিকে নানাবাড়ি গোপালপুর থেকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া।
লঞ্চের কেবিনে সেদিন আমাদের সহযাত্রী ছিলেন সাহেবরামপুর নিবাসী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং বর্তমান আমেরিকায় বসবাসরত ড. মিজানুর রহমান সাহেবসহ কালকিনি গৌরনদীর বেশ কয়েক জন সম্মানিত ব্যক্তি। পরদিন, অর্থাত্ ২৬শে মার্চ, ১৯৭১ মধ্যরাত্রের পর প্রায় সকাল চার/পাঁচ ঘটিকায় হঠাত্ অনুভব করলাম যে, লঞ্চটি চলছে না এবং ফতুল্লা ঘাটে স্থির হয়ে আছে। কেবিন থেকে বের হয়ে সারেং সাহেবকে কারণ জিজ্ঞাসা করলে জানতে পারলাম যে, ইয়াহিয়া-ভুট্টোর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্যরা গত রাত ১২ ঘটিকার পর ঢাকা শহরে ভয়াবহ আক্রমণ করে কয়েক হাজার মানুষ হত্যা করেছে। ২৬শে মার্চ ঊষালগ্নে ফতুল্লা লঞ্চঘাটের ওপরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের মহাসড়কে মুহুর্মুহু জয়বাংলা স্লোগানসহ সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ ও জনগণ বড় বড় গাছ ও বিভিন্ন সামগ্রীসহ প্রতিরোধ সৃষ্টি করছেন। আমাদের লঞ্চটি তখন ফতুল্লাহ লঞ্চঘাট ত্যাগ করে প্রথমে মুন্সীগঞ্জের মীর কাদিম বাজারে দুপুরের খাওয়াদাওয়া শেষ করে চাঁদপুর লঞ্চ টার্মিনালে পৌঁছলাম। মীর কাদিম ঘাটে পৌঁছানোর পূর্বে দেখতে পেলাম, নদীর কূল দিয়ে ঢাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ নারী-পুরুষ সমন্বয়ে বিশাল বিশাল কাফেলা ঢাকা থেকে প্রাণ বাঁচানোর জন্য রাজধানী ঢাকা ছেড়ে পদব্রজে বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে নদীর পাড়ের পথ দিয়ে মুন্সীগঞ্জের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তখনই সবাই আন্দাজ করে নিলাম যে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গতরাতে রাজধানী ঢাকায় হয়তো-বা এক বর্বরোচিত নারকীয় হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তা না হলে হাজার হাজার নর-নারী-শিশু কেন যার যার আবাসস্থল থেকে অসহ্য দুঃখ, কষ্টে এভাবে ঢাকা ছেড়ে জীবন বাঁচানোর জন্য কঠিন পথে হাঁটছেন?
আমাদের লঞ্চের চালক, চাঁদপুর পৌঁছানোর পর পুনরায় আমাদের সব যাত্রীকে নিয়ে টরকী বন্দরের লঞ্চঘাটে ফিরে যেতে রাজি হলেন না। কারণ তার ও লঞ্চের অপর কর্মচারী স্টাফদের পরিবার-পরিজন সবাই ঢাকায় অবস্থান করছেন। লঞ্চটির ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা মাদারীপুরগামী ভূঁইঞা কোম্পানির একটি লঞ্চে আমাদের মাদারীপুর পর্যন্ত সবার যাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। আমাদের লঞ্চে তখন ঢাকার পিলখানা ইপিআরের কয়েক জন সদস্যসহ আমরা ২৭শে মার্চ সকালে মাদারীপুর পৌঁছলাম। আমার সঙ্গে সফরসঙ্গী আমার অবুঝ ভাগনিকে কোনো কিছু আঁচ করতে দেইনি। ২৭শে মার্চ আমি ঐ রিকশাযোগে আমার ভাগনিকে নিয়ে গোপালপুর-ভূরঘাটা মহাসড়কে আমাদের বাড়ির সম্মুখে যখন পৌঁছলাম তখন প্রায় দুপুর ১টা থেকে দেড়টা ছিল। পৌঁছে দেখলাম, আমাদের গোপালপুর ইউনিয়নের ওপর দিয়ে বরিশাল-ফরিদপুর মহাসড়কের ওপর সহশ্রাধিক বিদ্রোহী জনতার লাঠি মিছিল ও সমাবেশ। আমি ঢাকা থেকে ফেরত এসেছি শুনে আমাকে ঐ বিশাল জনতা ঘিরে দাঁড়াল, ঢাকার সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার জন্য। তাদের সম্মুখে দাঁড়িয়ে ছোট ভাষণ আকারে আমার দেখা ঢাকা থেকে প্রাণভয়ে হাজার হাজার নারী-পুরুষ-শিশু-জনতার ঢাকা ছেড়ে পদব্রজে বুড়িগঙ্গা নদীর পশ্চিম তীর দিয়ে মুন্সীগঞ্জ মীরকাদিমের দিকে অগ্রসরমাণ জনতার কাফেলার কথা। সেদিনই আমি যোগদান করলাম গোপালপুর-কালকিনির ছাত্র-জনতার স্বাধীনতার আন্দোলনে। মাদারীপুর শহরে পাকিস্তানি বাহিনী প্রবেশ করেছিল ১৯৭১ এর ২৪শে এপ্রিল এবং বরিশাল শহরেও মোতায়েন করা হয়েছিল এপ্রিল মাসেই।
মাদারীপুর ও বরিশাল হানাদার বাহিনীর পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আমরা গোপালপুরের ছাত্র-যুবক স্থানীয় জনতাকে সংগঠিত করে প্রতিদিন প্রাথমিক সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হতো। অপরদিকে, দুপুর ও বিকাল থেকে শুরু করে ঢাকাসহ উত্তর বঙ্গের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যয়নরত ছাত্র/ছাত্রী শিক্ষক, কর্মচারী, কর্মকর্তা ও পশ্চিমবঙ্গের যশোহর, কুষ্টিয়া, খুলনা হতে বরিশাল, পটুয়াখালী ভোলার দিকে অগ্রসরমাণ জনগণ নারী, শিশুদের ও অসুস্থ অতিভূগ্রস্ত জনগণকে কালকিনির ভূরঘাটা বাজারে স্থাপিত বিশেষ অভ্যর্থনাকেন্দ্রে খাবার ও পানির ব্যবস্থাকরণ এবং ওপারের গৌরনদী-ভূরঘাটা বাজার হইতে দক্ষিণ বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের যাত্রীদের ঘরবাড়িতে ফিরে যাওয়ার পরিবহন ব্যবস্থাকরণসহ ভূরঘাটা বাজারের দুই জেলার সংযোগস্থলে প্রতিরোধ সৃষ্টি করার এক কঠিন ও মহত্ কাজে নিজকেও সেদিন সমর্পিত করেছিলাম আমার সাথীদের সঙ্গে এক দুর্ভেদ্য শক্তিশালী সংগ্রামী বাহিনী হিসেবে। ২৫শে এপ্রিল, ১৯৭১ তারিখে সকাল প্রায় ১১ ঘটিকায় আমি এবং আমার চাচাতো ভাই তখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স অধ্যয়নরত ও পরবর্তীতে ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক প্রধান মরহুম অধ্যাপক কাজী হান্নান ভাইসহ ভূরঘাটা বাজার হতে একটু দূরত্বে উত্তর-পশ্চিম দিকে আমাদের বাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছিলাম, তখন প্রায় অর্ধেক পথে যাওয়ার পরই উত্তর দিকে দেখলাম যে, মাদারীপুর থেকে বরিশালের দিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর জলপাই রঙের গাড়ির এক বিশাল বহর এগিয়ে আসছে।
আমরা দুই জন তখন অতিদ্রুত মহাসড়ক থেকে দৌড়ে পার্শ্ববর্তী আমাদের এক বিশাল জমির কোনায় গাছপালা, লতাগুল্মে বেষ্টিত বাহির থেকে অদৃশ্য প্রাকৃতিক এক আচ্ছাদনে ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে থাকলাম। মরহুম হান্নান ভাই ছিলেন একটু ভদ্র, নম্র, নিরীহ, শান্ত প্রকৃতির। হানাদারদের ধাবমান কনভয় দেখে তিনি একটু বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনীর কনভয়টি ভূরঘাটা বাজারের সম্মুখে এসে হঠাত্ থমকে দাঁড়ালে কনভয়ের শেষ প্রান্ত একটি সামরিক অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়ায় ঠিক আমাদের দুজনের লুকায়িত অবস্থান থেকে প্রায় ৪/৫ শত মিটার দূরত্বে এবং পশ্চিমে নিকটবর্তী অর্থাত্ মহাসড়কের পশ্চিমে অবস্থিত আমাদের বাড়ির সম্মুখে। হানাদার বাহিনীর নিকট হয়তো বা ভূরঘাটা-বরিশালমুখী সড়কের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার সংবাদ জানা ছিল, যে কারণে বরিশাল অভিমুখী ঐ বিশাল কনভয়টি ২০/২৫ মিনিটের জন্য স্থিতিশীল হয়ে দণ্ডায়মান ছিল, মনে হয়েছিল যে, হানাদার বাহিনীর সঙ্গে ইঞ্জিনিয়ারিং যান্ত্রিক কোরের সৈনিকেরা যন্ত্রপাতি, স্ক্যানার দিয়ে ব্রিজের গোড়ায় মাটির নিচে পরীক্ষানিরীক্ষা করে কোনো মাইন অথবা বিস্ফোরকের অস্তিত্ব আছে বা নাই, যথাযথ নিশ্চিত হওয়ার পরই আবার কনভয়টি বরিশালের অভিমুখে যাত্রা করল। ইতিমধ্যে আমি ও মরহুম হান্নান ভাই ঝোপের আড়াল থেকে ঘর্মাক্ত অবস্থায় বের হয়ে হানাদারদের গাড়ির কনভয়ের অবস্থান দেখছিলাম।
বরিশাল যাওয়ার পথে সর্বপ্রথম বার্থীর মন্দিরে অগ্নিসংযোগ করে কর্তব্যরত পুরোহিত বা ঠাকুরকে হত্যা করে ও মহাসড়কে বিক্ষিপ্তভাবে পায়চারিকৃত ভূরঘাটা বাজারের সকলের প্রিয় মাস্তানজিকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। ২৭/২৮ এপ্রিল, ১৯৭১ পাকিস্তানি বিমান বাহিনীর দুটি সম্ভবত হাল্কা আক্রমণকারী বিমান অতর্কিত গৌরনদীর ওপারের ভূরঘাটা হতে শিকারপুর-উজিরপুর মহাসড়কের ওপর সমবেত জনতা ও হাজার হাজার পথচারী বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর বিমান থেকে সমগ্র মহাসড়কের ওপর Aerial Shelling বা গোলাবর্ষণ শুরু করে। আমিসহ তখন অনেকেই ওপারের ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন হোটেলস্থ স্থানীয় সংগ্রাম পরিষদের প্রধান যোগাযোগ কেন্দ্রের পিছনে এক বিশাল ডোবা নালা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আশ্রয় নিয়েছিলাম। বিমান হামলা বন্ধ হওয়ার প্রায় আধাঘণ্টা পর আমি অবলোকন করলাম যে, আমার পায়ের স্যান্ডেলের পাটির সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে রক্তে আঠাযুক্ত হয়ে আছে। তখন বুঝলাম যে, ঐ বিশাল ডোবায় স্তূপকৃত আবর্জনার মধ্যে ভাঙা কাঁচের বোতল অথবা কোনো একটি ধারাল তীক্ষ বস্তুর আঘাতে আঙুলের রক্তক্ষরণ হয়েছে। আমার বাবা বৃটিশ সময়ে দারজিলিংয়ের অক্সফোর্ড বিদ্যালয়ে তখনকার এনট্রান্স পরীক্ষা শেষে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে চাকরি করেছেন এবং তার চাচা সার্জন অফ ইন্ডিয়া মরহুম কাজী আব্দুস সাত্তারের তত্ত্বাবধানে পড়াশুনা করেছিলেন। বাবা উর্দু, হিন্দি এবং ইংরেজিতে পরদর্শী ছিলেন এবং অনর্গলভাবে কথা বলতে পারতেন ও বুঝতেন বিধায় আমাদেরকে বলেছিলেন যে, তোমরা নিরপদ স্থানে আত্মগোপনে চলে যাও।
কালকিনি ও পার্শ্ববর্তী গৌরনদীতে চলমান প্রতিদিনকার এই নারকীয় হত্যা, ধর্ষণ, জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতন, লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞ ও পাকিস্তানি ঘাতক হানাদার বাহিনীর উপযুক্ত ও শক্তিশালী জবাব প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় যথাযথ সামরিক ও গেরিলা প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে নিজেদেরকে যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে আমিসহ সর্বজনাব কাজী হুমায়ুন কবির ও অগ্রজ ভ্রাতা কাজী সবুর ফরহাদ, মরহুম কাজী সাইদুর রহমান, আব্দুর রহিম মাস্টার, সৈয়দ মোশারফ হোসেনসহ গোপালপুর ও বীরমোহন মাইজপাড়ার কয়েক জনসহ প্রায় ২০ জনের একটি দল ভারতের ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় চলে গিয়েছিলাম। আমাদের দেশত্যাগ করে ভারতের ত্রিপুরায় যাওয়ার বিষয়ে উত্সাহ ও সহযোগিতা করেছিলেন আমাদের চাচাতো ভাই, রাজনীতির দিক দিয়ে বেশ সচেতন, স্বাধীনতা ও গেরিলা যুদ্ধের ইতিহাসে উদ্বুদ্ধ ও কঠোর মনোভাবের অধিকারী মরহুম কাজী বোরহান ভাই। ভারতের ত্রিপুরাস্থ আগড়তলা যাত্রাটি ছিল আমাদের জন্য যেমন দুরুহ, ঝুঁকিপুর্ণ তেমনি এক অনিশ্চিত যাত্রা। আমাদের টিমের কয়েক জন ছিলেন গ্রামের সহজ-সরল, সাদাসিদে মানুষ। বিদেশের এই মহাসংকটকালে নিজেদের ভবিষ্যত্ অবস্থান কী হবে ভেবে খুবই বিচলিত হয়ে পড়লেন। তখন আমি ও অগ্রজ ফরহাদ ভাই দ্রুত মানবিক দিক বিবেচনা করে সহযাত্রী টিমের সদস্যদের ত্যাগ করে দেরাদুনে প্রশিক্ষণে যাওয়ার মনবাসনা ত্যাগ করলাম। সবাই এই কথা শোনার পর সহসাই তাদের চোখেমুখে আবার আনন্দের অশ্রুবন্যা বয়ে যায়।
বিজনা ইউথ ক্যাম্পে দুই/তিন দিন থাকার পর আমাদের নেওয়া হয়েছিল আগড়তলা শহর থেকে প্রায় ৩০/৩৫মাইল দূরত্বে ‘গঙ্গা ইউথ ক্যাম্পে’ ক্যাম্পটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ভারতীয় সামরিক বাহিনীর বাঙালি ক্যাপ্টেন চাতার্জী। গঙ্গা-যমুনা পাশাপাশি দুইটি ক্যাম্প। ত্রিপুরা বাংলাদেশের পশ্চিম অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত আমাদের গেরিলা প্রশিক্ষণের প্রত্যাশী অসংখ্য তরুণ যুবক মাতৃভূমি বাংলাদেশকে পাকিস্তানি হানাদারদের কবল থেকে মুক্ত করার এক দৃঢ় লৌহ ইস্পাতের ন্যায় শক্ত মনবল ও চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে গেরিলা, সামরিক যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য ইয়ুথ ক্যাম্প দুটো-সহ আগড়তলার বিভিন্ন ক্যাম্পে সমবেত হয়েছিলেন। লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষক







