প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ২৩, ২০২৬, ৩:১৩ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুন ১১, ২০২৬, ৮:৩২ অপরাহ্ণ
নারায়ণগঞ্জ-লাকসাম কর্ডলাইন নির্মাণ, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে দূরত্ব হ্রাস

বাংলাদেশ রেলওয়ে দেশের প্রধান দুই অর্থনৈতিক হৃদপিণ্ড ঢাকা এবং চট্টগ্রামের মধ্যকার যাতায়াত ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-কুমিল্লা (লাকসাম) কর্ডলাইন (সোজা পথ) রেলপথ নির্মাণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে অর্থমন্ত্রী এই মেগা প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন। দেশ স্বাধীনের আগে ১৯৬৮ সাল থেকে এই রেললাইনটি নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও দীর্ঘ সময় পর বর্তমান সরকার এটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার ট্রেনগুলোকে টঙ্গী, ভৈরব ও আখাউড়া হয়ে দীর্ঘ পথ ঘুরে যাতায়াত করতে হয়, যার ফলে বর্তমান রেলপথের মোট দূরত্ব প্রায় ৩২০ কিলোমিটার। এই দীর্ঘ ও আঁকাবাঁকা পথের কারণে সাধারণ এক্সপ্রেস ট্রেনগুলোর চট্টগ্রামে পৌঁছাতে প্রায় ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। নতুন এই সোজা কর্ডলাইনটি নির্মিত হলে এই রুটের যাত্রাদূরত্ব প্রায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার কমে আসবে এবং মোট রেল দূরত্ব মাত্র ২৩০ থেকে ২৪০ কিলোমিটারে নেমে আসবে। এর ফলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পৌঁছাতে যাতায়াতের সময় অন্তত দেড় থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত সাশ্রয় হবে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ যাতায়াতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে।
কারিগরি পরিকল্পনা ও রুট এলাইনমেন্ট : কারিগরি নকশা অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ হয়ে মুন্সীগঞ্জ ও কুমিল্লার মধ্য দিয়ে লাকসাম জংশন পর্যন্ত প্রায় ৮২ থেকে ৯০ কিলোমিটার সম্পূর্ণ নতুন ডাবল গেজ ট্র্যাক তৈরি করা হবে। এই নতুন ট্র্যাকে ট্রেনগুলো সর্বোচ্চ ১৬০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়ামের (জাপানের ওরিয়েন্টাল কনসালটেন্ট গ্লোবাল, ফ্রান্সের ইজিস এবং মালয়েশিয়ার এইচএসএস) সহযোগিতায় নতুন করে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। বিশেষজ্ঞরা এই কর্ডলাইনের জন্য চারটি বিকল্প রুট নিয়ে কাজ করছেন, যার মধ্যে অর্থনৈতিক সুবিধা এবং ভৌগোলিক উপযোগিতা বিবেচনা করে সেরা রুটটি চূড়ান্ত করা হবে। এই নতুন লাইনে মোট ১১টি আধুনিক রেলওয়ে স্টেশন এবং প্রয়োজনীয় রেল সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। কর্ডলাইনটি নির্মিত হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের বিরতিহীন ট্রেনগুলো (যেমন সোনার বাংলা বা সুবর্ণ এক্সপ্রেস) সরাসরি এই রুট ব্যবহার করবে।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও লজিস্টিক হাব : এই মেগা প্রকল্পের মূল অর্থনৈতিক লক্ষ্য হলো একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ে করিডোর’ প্রতিষ্ঠা করা। নতুন কর্ডলাইনটি চালু হলে সেটিকে মূলত দ্রুতগতির যাত্রী পরিবহনের জন্য ব্যবহার করা হতে পারে, এবং বর্তমান সচল থাকা ৩২০ কিলোমিটার দীর্ঘ টঙ্গী-ভৈরব-আখাউড়া লাইনটিকে ভারী পণ্য ও কনটেইনার পরিবহনের জন্য ডেডিকেটেডলি ব্যবহার করা যাবে। এতে করে দেশের প্রধান বাণিজ্যিক শহর চট্টগ্রাম একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক লজিস্টিক হাবে রূপান্তরিত হবে। যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের সময় কমে যাওয়ায় জ্বালানি খরচ বাঁচবে এবং সড়কপথের ওপর থেকে যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ ও যানজট অনেকাংশে হ্রাস পাবে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এই প্রকল্পে বড় অঙ্কের অর্থায়নে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও স্থানীয় মানুষের দাবি : প্রকল্পটির মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই জমি অধিগ্রহণ নিয়ে কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার দেউলী চৌরাপাড়ার মতো কিছু প্রাচীন ও ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকার ওপর দিয়ে রেললাইন নেওয়ার প্রাথমিক নকশা করায় স্থানীয় বাসিন্দারা উচ্ছেদ ও পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বসতবাড়ি ও কলকারখানা রক্ষার স্বার্থে স্থানীয় নাগরিকরা এই রেললাইনটি আবাসিক এলাকার ভেতর দিয়ে না নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশ দিয়ে খাস জমিতে নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষও স্থানীয় জনবসতির ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখতে বিকল্প রুট ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছে।
Copyright © 2026 সত্যের উন্মোচন. All rights reserved.