ঢাকামঙ্গলবার , ২৮ এপ্রিল ২০২৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পারমাণবিক যুগে বাংলাদেশ

admin
এপ্রিল ২৮, ২০২৬ ৯:০২ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় মাইলফলক হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। দীর্ঘ প্রায় ছয় দশকের স্বপ্ন, পরিকল্পনা এবং অপেক্ষার পর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে পারমাণবিক শক্তির অভিজাত ক্লাবে প্রবেশ করেছে। পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার পদ্মাপাড়ের রূপপুর গ্রামে নির্মিত এই প্রকল্পটি দেশের ইতিহাসে একক বৃহত্তম এবং সবচেয়ে ব্যয়বহুল অবকাঠামো। এটি শুধুমাত্র একটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের কেন্দ্র নয়, বরং এটি বাংলাদেশের উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার বাস্তবতা। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইতিহাস বেশ পুরনো এবং সংগ্রামমুখর। ১৯৬১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান আমলে প্রথম এই প্রকল্পটির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। ১৯৬২ সালে স্থান হিসেবে রূপপুরকে নির্বাচন করা হয় এবং জমি অধিগ্রহণ করা হয়। কিন্তু স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানি শাসকদের বৈষম্যমূলক নীতির কারণে এই প্রকল্প কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রকল্পটি পুনরায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। তবে ১৯৭৫ সালের পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে এটি আবার স্থবির হয়ে পড়ে। দীর্ঘ এক নির্বাসন কাটিয়ে ২০০৮ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়। সরকার গঠনের পর ২০০৯ সালে রাশিয়ার সাথে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় এবং এর মাধ্যমে রূপপুরের নতুন যুগ শুরু হয়। ২০১৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঈশ্বরদীতে প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ের নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এরপর ২০১৭ সালের নভেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে মূল রিঅ্যাক্টর ভবনের প্রথম কংক্রিট ঢালাইয়ের মাধ্যমে শুরু হয় ভারী নির্মাণ কাজ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২,৪০০ মেগাওয়াট। এতে দুটি ইউনিট রয়েছে এবং প্রতিটি ইউনিট থেকে ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে –

প্রকল্পটিতে রাশিয়ার সর্বাধুনিক ৩+ প্রজন্মের (Generation 3+) ‘ভিভিইআর-১২০০’ (VVER-1200) প্রেশারাইজড ওয়াটার রিঅ্যাক্টর ব্যবহার করা হয়েছে। এটি বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ এবং আধুনিক পারমাণবিক প্রযুক্তি। কেন্দ্রটির মূল জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়াম (U-235) ব্যবহার করা হচ্ছে। ইউরেনিয়াম ডাই অক্সাইডের ছোট ছোট পেলেট বা দানা এই চুল্লির জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। এই কেন্দ্রের মূল উৎপাদন সচল থাকবে টানা ৬০ বছর পর্যন্ত, যা প্রয়োজনে আরও ২০ বছর বাড়ানো সম্ভব। বর্তমান সময়কাল তথা ২০২৬ সালের পরিস্থিতি অনুযায়ী, রূপপুর কেন্দ্রটি তার ঐতিহাসিক মাইলফলকে পৌঁছেছে। ২০২৬ সালের ১৬ এপ্রিল পরমাণু শক্তি কমিশন তাদের অপারেটিং লাইসেন্স লাভ করার পর কেন্দ্রটি পরিচালনার বৈধ অধিকার পায়। পরবর্তীতে ২৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে প্রথম ইউনিটে সফলভাবে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। পারমাণবিক জ্বালানি লোড করার অর্থ হলো কেন্দ্রটি তার নির্মাণ পর্ব থেকে উৎপাদন পর্বে প্রবেশ করেছে।

২০২৬ সালের জুলাইয়ের শেষ নাগাদ বা আগস্ট মাসের মধ্যে এই কেন্দ্র থেকে পরীক্ষামূলকভাবে প্রাথমিক ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি তার পূর্ণ সক্ষমতায় (১,২০০ মেগাওয়াট) পৌঁছাতে পরবর্তী ১০ থেকে ১২ মাস সময় লাগতে পারে। প্রথম ইউনিট পুরোদমে চালুর পর দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও দ্রুত শেষ করে জাতীয় গ্রিডে আরও ১,২০০ মেগাওয়াট যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রধান উদ্বেগ থাকে এর নিরাপত্তা নিয়ে। ১৯ Chernobyl বা ২০১১ সালের Fukushima দুর্ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছিল। তবে রূপপুর প্রকল্পে এসব দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সর্বাধুনিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে।

রিঅ্যাক্টরের মূল জ্বালানি থেকে শুরু করে পুরো ভবনটিকে ৫টি শক্তিশালী ভিন্ন ভিন্ন স্তরে ঢেকে রাখা হয়েছে। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে যদি পারমাণবিক চুল্লির কেন্দ্র গলনে আক্রান্ত হয়, তবে তেজস্ক্রিয়তা মাটির নিচে বা পরিবেশে যাওয়া আটকাতে নিচে একটি স্বয়ংক্রিয় ‘কোর ক্যাচার’ পাত্র বসানো আছে। এই ভবন এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যা রিখটার স্কেলে শক্তিশালী ভূমিকম্প, ভয়াবহ সুনামি এমনকি কোনো যাত্রীবাহী বিমানের সরাসরি ধাক্কা সামলাতেও সক্ষম। পারমাণবিক শক্তি সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি গ্রিনহাউস গ্যাস বা ক্ষতিকর ধোঁয়া বাতাসে ছড়ায় না. ফলে এটি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় দেশের জন্য বিরাট সহায়ক হবে।

বাংলাদেশ বর্তমানে জীবাশ্ম জ্বালানি বা খনিজ তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লা বা গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পেলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন চরম সংকটে পড়ে. কিন্তু পারমাণবিক শক্তি সেই সংকট দূর করবে। মাত্র ১ কেজি ইউরেনিয়াম থেকে প্রাপ্ত শক্তি প্রায় ১০০ টন কয়লা পোড়ানোর সমান বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে পারে। একবার জ্বালানি লোড করলে তা থেকে টানা ১৮ মাস নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, যেখানে প্রতিদিন কয়লা বা গ্যাস কেনার কোনো দুশ্চিন্তা থাকে না। দেশের ভারী শিল্প এলাকাগুলো সার্বক্ষণিক ভোল্টেজ বা ফ্রিকোয়েন্সি ওঠানামা ছাড়াই মানসম্মত বিদ্যুৎ পাবে। ফলে রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস ও ইস্পাত শিল্পে আসবে গতিশীলতা। দীর্ঘমেয়াদে দেশের সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ বিলের খরচ বা উৎপাদন ব্যয় সহনীয় মাত্রায় নেমে আসবে।

রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘রোসাটম’ সরাসরি কাজ করেছে. প্রকল্পের মোট ব্যয়ের সিংহভাগ বা প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থ রাশিয়া বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদী সহজ ঋণ হিসেবে প্রদান করেছে। এই সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যকার ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। রাশিয়া শুধুমাত্র নির্মাণ করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না; তারা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) এর নিয়মানুযায়ী কেন্দ্রের তেজস্ক্রিয় বর্জ্য বা Spent Fuel পুরোপুরি নিজেদের দেশে ফেরত নিয়ে যাওয়ার চুক্তি করেছে. এর ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাংলাদেশের ওপর কোনো অতিরিক্ত বোঝা থাকছে না।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি যেমন জাতীয় গৌরবের একটি প্রতীক, তেমনই এর দীর্ঘ নির্মাণযজ্ঞে বেশ কিছু বড় ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত এবং আদালতে গড়ানো সেই বহুল আলোচিত দুর্নীতির তথ্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো। প্রকল্পটির ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত এবং লোকমুখে প্রচারিত দুর্নীতির ঘটনাটি ঘটে ২০১৯ সালে, যা ইতিহাসে রূপপুর বালিশ কেলেঙ্কারি নামে পরিচিতি পায়। রুশ প্রকৌশলী ও প্রকল্প কর্মকর্তাদের থাকার জন্য তৈরি হওয়া আবাসন এলাকা ‘গ্রিন সিটি’র ভবনের আসবাবপত্র কেনাকাটায় এই নজিরবিহীন হরিলুট চালানো হয়। গণপূর্ত বিভাগের আওতায় ৯৬৬টি ফ্ল্যাটের জন্য আসবাবপত্র কেনার সময় বাজারমূল্যের চেয়ে বহুগুণ বেশি দাম দেখানো হয়েছিল। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় যে, প্রতিটি বালিশের ক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছিল ৫,৯৫৭ টাকা এবং নিচতলা থেকে সেই বালিশ ওপরে তোলার মজুরি বা বহন খরচ দেখানো হয়েছিল ৭৬০ টাকা  একইভাবে একটি ইলেকট্রিক চুলা ক্রয়ের খরচ ৭,৭৪৭ টাকা দেখানোর পাশাপাশি সেটি ওপরে তোলার খরচ ধরা হয়েছিল ৬,৬৫০ টাকা।

এই ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মাঠে নামে. ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুল আলমসহ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে চালান করা হয়. বিভাগীয় তদন্তে অনেক কর্মকর্তার সাজা এবং বাধ্যতামূলক অবসরও কার্যকর করা হয়। ২. ৫ বিলিয়ন ডলার আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের নতুন তদন্ত (২০২৪-বর্তমান) ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই মেগা প্রকল্পের মূল খরচ নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে আসে. আন্তর্জাতিক কিছু সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে দেশের উচ্চ আদালতে একটি রিট করা হয় এবং পরবর্তীতে দুদক আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করে।

গণমাধ্যমের বিভিন্ন উন্মুক্ত উৎসের বরাতে দাবি করা হয় যে, পুরো প্রকল্পের মোট ১২.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বাজেটের মধ্যে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার (যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা) মূল প্রকল্পের অতিরিক্ত ব্যয় কৃত্রিমভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে (inflated cost) আত্মসাৎ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রথম আলো ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই ৫ বিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্তে ৫ সদস্যের একটি বিশেষ টিম গঠন করে অনুসন্ধান চালাচ্ছে. এই অভিযোগে তৎকালীন শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং সহায়তাকারী রুশ কর্মকর্তাদের নাম উঠে এসেছে. তবে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রোসাটম এসব অভিযোগকে শুরু থেকেই ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, বিডিনিউজ২৪।